বাংলা কবিতা
অথ নয়ন-কুসুম কথা
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
মায়ের সঙ্গে থাকতাে ছেলে আমড়াতলায়
খাপড়া চালের ছোট্ট বাড়ি, রােদ ঢােকে না।
উঠোন ভ'রে থাকতাে শাদা সজনেফুলে
মৌমাছিরা গুনগুনাতাে ধিন্ তা ধিনা।
চক্ষু দুটি না তাহার জন্ম থেকেই
কষ্ট করে হাঁটতে হতো দেয়াল ধ'রে
হ্যাংলা হেলে প্যাংলা ছেলে, বলতাে লােকে
ঘাস-বিচালির মতন বাড়তো এমনি করেই।
মা নিশিদিন খাটনি খাটে লােকের বাড়ি
টুকরো-টাকরা, ঠিকে ঝি-এর মধ্যে নামী
চট্ -ঝটিতি কাজ পেয়ে তার তুষ্ট সবাই
সবার বাছাই, আমড়া-বামী।
প্রথম প্রথম সঙ্গে নিত নয়নকে তার
পায়ের গােছে বাঁধতাে দড়ি আটকে দিত
কাজ ফুরুলে কাঁকাল চেপে অন্য বাড়ি––
একলা মানুষ, নয়নকে তার কে দেখিত ?
দেখার যে সে পালিয়ে গেছে, গৰু-ঠিকানী
কারণ তাে নেই কারণ তাে নেই কারণ তাে নেই
মুখ বুজে সব সহ্য করে আমড়া-বামী।
শুদ্ধ নয়ন অন্ধ ? তা হােক পুত্র বটেই।
ভগবানের কাছে নালিশ করবে কতাে ?
ঢিব–কপালে যা পেয়েছে যথেষ্ট তাই,
গতর ঠেলে বাঁচতে পারা অল্প তাে না
পান্তা ভাতে নুন জোটে তাে ? ওইটুকু চাই।
পুজোর আগে ঘােষাল গিন্নি নতুন জামা
গেঞ্জি-ইজের বিছিয়ে দিতেন শক্ত দেখে,
এখন তিনি কাশীবাসী, কপাল মন্দ
এবার পুজোয় নতুন জামা দিচ্ছেটা কে !
নাম রেখেছে ' নয়ন বামী দুঃখ করে,
এইটুকুনই পক্ষপাতের বিরুদ্ধতা।
পাশের বাড়ির কুসুম ওকে পদ্য পড়ায়
লেখাপড়ায় কী মমতা।
শুনে শুনেই শিখছে নয়ন পদপঠন,
নানান দেশের গপ্ গাে-কথা মুখস্থ তার,
নামতা জানে, কাজ চালানাে হিসেব নিকেশ,
দেশের কথা, একটু আধটু, ঠোট তার।
এমনি করে জলের মতোই যাচ্ছিলো দিন
কুসুম-নয়ন নয়ন-কুসুম একটি দাঁড়ে––
হঠাৎ বয়েস বললাে : তফাৎ রােক্ কো গাড়ি––
সহজ ফুলের বাগান ভাঙে ক্ষিপ্ত ষাঁড়ে।
নয়ন বলতাে, কী কথা তার লিখতে হবে
কুসুম ফি-দিন লিখতে চিঠি ঠিকানাহীন,
— কাজ তাে তােমার শেষ হয়েছে, এখন ফেরাে
বাবা, বাবা –বহুৎ কষ্টে কাটাচ্ছি দিন।
ছিন্ন চিঠি রাখতাে নয়ন কাঁথার তলে
সেখানে তার শয্যা ছিল ছেঁড়াখোঁড়া
— আমার ভ্রমপর্বটি শেষ, ফিরে এলাম
কুসুম জানায়, আত্মঘাতী নয়ন ছোঁড়া।
দড়ির ফাঁসে শেষ করেছে ধুকপুকুনি
কারণ তাে নেই কারণ তাে নেই কারণ তাে নেই
ছিন্ন চিঠি ছড়িয়ে দিলুম বুকের পরে—
আগুন তাে খায় সব কিছুকেই॥
কাব্যগ্রন্থ-
মিষ্টি কথায়, বিষ্টিতে নয়
KHOKON