বাংলা কবিতা
অ!
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
এই চট্ করে যাহা বলে ফেলা যায়
চুট্ কি তাহারে কয়,
ওগো ছোট লেখা যত লেখে ছোটলোকে
জানিবে সুনিশ্চয়।
ওই চুট্ কি রচনা কেট্ কেট্ গ্র্যাম্
বিকিকিনি চলে চোটে,
ওযে ফুট্ কড়ায়ের ছুট্ কো বেসাতি
হুণ্ডি চলে না মোটে।
ভুয়ো সজ্ নের খুঁটি চুট্ কি রচনা
দেখিতে নিরেট বটে,
ভায়া, ভর দিলে ভারে ভেঙে পড়ে চাল
আয়ু-সংশয় ঘটে।
ওগো লিখো না চুট্ কি, লিখিলে পুড়িবে
যশোভাগ্যেতে দ,
আর পণ্ডিত-সভা পুছিবে না তোরে
দুখ না ঘুচিবে।---
( কোরাস ) অ!
দেখ চুট্ কি সূত্র গোটা সত্তর
লিখিল সাংখ্যকার,
তাই কন্ফারেন্সে ডায়েসের পরে
চেয়ার পড়েনি তার।
দাদা, তিনটি ভালুমে লিখিলে মালুম.
হইত এলেম যত,
আর দর্শন-শাখে হত যোগে-যাগে
শাখা-পতি অন্তত।
হায় অল্পে সারিতে মরিল বেচারা
লিখে হ য ব র ল,
এই জম্বুদ্বীপে কোনো ফেলোশিপে
বক্তা না হল।---
( কোরাস ) অ!
দেখ হাফেজ কেবল চুট্ কি লিখিল
ফেজ খোয়াইল তাই,
আর রবি শেলি রুমি বার্ণস্ হাইন
পড়ে সে কজন ভাই ?
হোথা শ্লোক তিন টন লিখি মিলটন
অমর হইল ভবে,
লোকে পড়ে কি না পড়ে জানেন বিধাতা,
হরি হরি বল সবে।
ওগো লেখ লুসিয়াড্ লেখহ মেসায়া
অথবা রৈবতক,
আছে সস্তার ছাপাখানা যতদিন
রইবে সে ইস্তক।
আর বিপুল গতর দেখি কেতাবের
দুনিয়াটা হবে থ,
যত বেকার ক্রিটিক্ ভুলি টিক্ টিক্
‘ঠিক্ ঠিক্’ কবে।
( কোরাস ) অ!
দেখ ছ-শো-পাতা-রেগুলেশন নভেল
বটতলা লিখেছেন,---
বাপু, বঙ্কিম যার তুলনে চুট্ কি
Bambooর কাছে Cane !
এখন বাঁশের চাইতে যাঁহাদের মতে
কঞ্চি অধিক দড়,
হায় তাহারা বলিবে চুট্ কি-লেখক
বঙ্কিমবাবু বড়!
হা হা কাঁচা মগজের ধাঁচা ওযে---ওকি
লিটারেচারের ল,
ওগো চটক-মাংস চুটকিতে পেট
ভরে না মোদের।
( কোরাস ) অ!
দেখ দুএক অঙ্কে মেটারলিঙ্কী
চুট্ কি নাটক আছে,
হুঁ হুঁ দাঁড়াতে কি তাহা পারে দেড়-সেরী
যাত্রা-পালার কাছে ?
ওগো চটক দেখিয়া ভুলিও না কেউ,
ভুলিও না চুট্ কিতে,
বড় মজা পাবে রায়-মশায়ের বড়
গীতাভিনয়ের গীতে।
তাহে পাবে খাঁটি সুর যেন চিটা গুড়
হুবু চিনি সে যে raw,
আর চিটা সে শুদ্ধ, চিনি অশুদ্ধ
শাস্ত্রে লিখেছে।---
( কোরাস ) অ!
দেখ বিশ্বামিত্র আড়াই ছত্রে
রচিল গায়ত্রী,
উহা চুট্ কি বলিয়া পাইল না ঋষি
ফলারের পত্রী।
শেষে মীনরূপে হরি চুট্ কি চুনিল,
ঘোর কলি! ঘোর কলি!
ওরে দেবতার লীলা মানবে ছলিতে,
ছলে ভুলিও না ভাই,
চুপ্ রাঘব-বোয়াল কাব্য এখনি
ভাষা জলে দিবে ঘাই!
ওহো কলমের ডগে ফাৎনা লাগাও
নড়িও না এক য’
( কোরাস ) অ!
দেখ রৌদ্র রসের চুটকি রচনা
লা মার্সে ঈজ্ গান,
ও সে চুট্ কি বলিয়া হল না আদর,
হল না ক সম্মান।
এখন যুদ্ধের কালে গাহে ইউরোপ
হোমারের ইলিয়াদ্,
ওরে চুটকি ছাড়িয়া মহাকাব্যের
মহা মহা খাতা বাঁধ!
ওরে বড় বড় বই লিখে ক্রমশই
মানুষের মত হ।
দেখ্ ধারে না কাটিস ভারে কেটে যাবি
কাটা নিয়ে কথা।---
( কোরাস ) অ!
ওরে ইতিহাস কেউ লেখেনি চুট্ কি
কিম্বদন্তি জুড়ি’
ঢালি তিন পয়সার তাম্রশাসনে
টিপ্পনি ত্রিশ ঝুড়ি।
আর গুরুগম্ভীর বিজ্ঞান-পুথি
পড়ানো হবে না পুত্রে,
ওতে চুট্ কি ঢুকেছে, লিখেছে---বিজলি
ধরেছে ঘুড়ির সূত্রে।
আর চায়ের কেট্ লি ডাকন ঠেলিয়া
নাচন দেখায় তারি,
হল হাজার চুট্ কি গল্পের ভারে
ভিজা কম্বল ভারী।
যদি পুছ ‘কেন মাথে চুট্ কি?’ ওযে গো
আত্মা-বটের ব,
ওগো ও যে চৈতন, চাঁই হয় উহা
চুট্ কি দলের।---
( কোরাস ) অ!
ওগো চুট্ কি লিখিলে থেকে যাবে মনে
আরসোলা-চাটা-ভয়,
হয় কীর্ত্তি লোপের সুবিধা বেজায়।
ছোট লেখা আর নয়!
লেখ এমন গ্রন্থ যাহা পাঁজাকোলা
করেও না যায় তোলা,
আর চারি-যুগে চাটি ফুরাতে নারে যা
দুনিয়ার আরসোলা।
ওরে লেখ ব্যাসকূট দাঁতে বিস্কুট
আদা জল খেয়ে ল,
শুধু বিরাট হইলে হইবে কেতাব
অজর অমর।---
( কোরাস ) অ!
দেখ বিনা সম্বল বেকার উড়িয়া
চুট্ কির কাম করে,
ওসে ভিক্ষার চাল জড়ো করি শেষে
বেচে গো সুবিধা দরে।
ওগো ‘চুট্ কি লেখা যে চুট্ কির কাম,’
উড়িয়ার কাজ ভাই,
উহা তোমরা করিলে আমরা সবাই
লজ্জায় মারা যাই।
ছি ছি চুট্ কি ঘৃণ্য দৈন্যের ধ্বজা,
দুটি শুধু তার ভালো,
ওগো পণ্ডিত শির নারীর চরণ
চুট্ কিতে করে আলো!
ওরে এ দুটি চুট্ কি রক্ষা করিয়া
রণে আগুয়ান হ,
আর চুট্ কি-নিধনে চ রে ভাই, জিভে
দিয়ে খর শান।
( কোরাস, হাই তুলিতে তুলিতে ) অ!
রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “প্রবাসী” পত্রিকার বৈশাখ ১৩২২ (এপ্রিল ১৯১৫) সংখ্যায়। ২০চৈত্র ১৩২১ তারিখে (৩/৪ এপ্রিল ১৯১৫) বর্ধমানে, অষ্টম বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলনের প্রধান সভাপতি রূপে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাঁর ভাষণে রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির গুরুত্বকে “চুট্ কি” রচনার মর্যাদা দিয়ে তুচ্ছ জ্ঞান করেছিলেন। প্রবাসীর পরের সংখ্যাতেই সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, এই কবিতাটি লিখে সেই ঘটনার প্রতিবাদ করেছিলেন।
KHOKON