KHOKON

_

কবর-ই-নূরজাহান্‌ - সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

বাংলা কবিতা
কবর-ই-নূরজাহান্‌ সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত "বর ম্যজারেমা গরীবাঁ ন্যঃ চেরাগে ন্যঃ গুলে! ন্যঃ পরে পরমানা সুজদ্‌ ন্যঃ স্যতায়ে বুলবুলে॥” আজকে তোমায় দেখতে এলাম জগৎ-আলো নূরজাহান ! সন্ধা-রাতের অন্ধকার আজ জোনাক-পোকায় স্পন্দমান। বাংলা থেকে দেখতে এলাম মরুভূমির গোলাপ ফুল, ইরান দেশের শকুন্তলা! কই সে তোমার রূপ অতুল? পাঁষাণ-কবর-বোরকা খোলো দেখবো তোমায় সুন্দরী ! দাঁড়াও শোভার বৈজয়ন্তী ভূবন-বিজয় রূপ ধরি। জগৎ-জেতা জাহাঙ্গীরের জগৎ আজি অন্ধকার, জাগ তুমি জাহান্-নূরী আলোয় ভর দিক আবার ; কর গো হতশ্রী ধরায় রূপের পূজা প্রবর্ত্তন--- কত যুগ আর চল্ বে অলীক পরীর রূপের শব-সাধন? জাগাও তোমার রূপের শিখা, মরে মরুক পতঙ্গ ; রতির মুরতিতে জাগ, অঙ্গ লভুক অনঙ্গ। রূপের গোলাপ রোজ ফোটে না বুল্ বুলে তা জানে গো, গোলাপ ঘিরে পরস্পরে তাই তারা ঠোঁট হানে গো ; --- তুচ্ছ রূপার তরে মানুষ করছে কত দুষ্কৃতি, রূপের তরে হানাহানি, তার চেয়ে কি বদ্‌ রীতি? খনির সোনা নিত্য মেলে হাট বাজারের দুই ধারে, রূপের সোনা রোজ আসে না, বেচে না সে পোদ্দারে। ============================= রূপের আদর জান্ ত সেলিম, রূপ-দেবতায় মান্ ত সে ; সোনার চেয়ে সোনা মুখের ঢের বেশী দাম জান্ ত সে ; বিপুল ভারত-ভূমির সোনা সঞ্চিত তার ভাণ্ডারে তবুও কেন ভরল না মন? হায় তৃষিত চায় কারে? তোমার সোনা মুখটি ম্মরি' পাগল-সমতুল্য সে, রূপের ছটায় ঝলসেছে চোখ পুণ্য পাতক ভুল্ ল সে,--- রক্ত-সাগর সাঁৎরে এসে দখল পেল পদ্মটির রূপের পাগল, রূপের মাতাল, রূপের কবি জাহাঙ্গীর।--- টাঁকশালে সে হুকুম দিল তোমায় পেয়ে পুর্ণকাম “টাকায় লেখ জাহাঙ্গীরের সঙ্গেতে নূরজাহাঁর নাম।” মোহরে নাম উঠল তোমার, লেখা হল তায় শ্লোকে, --- “সোনার হ’ল দাম শত গুণ নূরজাহানের নাম যোগে।” ============================= মরুভূমির শুষ্ক বুকে জন্মেছিলে সুল্ তানা! গরীব বাপের গরব-মণি সাপের ফণা আস্তানা। তোমায় ফেলে আস্ ছিল সব, আস্ তে ফেলে পারল কই? দৈন্য দশার নির্মমতা টিঁকল না দু দণ্ড বই। জয়ী হ'ল মায়ের অশ্রু, টলে গেল বাপের মন, ফেলে দিয়ে কুড়িয়ে নিল স্নেহের পুতুল বুকের ধন। মরুভূমির মেহেরবাণী! তুমি মেহের-উন্নিসা! তোমায় ঘিরে তপ্ত বালুর দহন চিরদিন-নিশা ! পথের প্রসূন ! তোমার রূপে দুর্নিয়তি আকৃষ্ট--- ফেলে-দেওয়া কুড়িয়ে-নেওয়া এই তো তোমার অদৃষ্ট! ============================== দিনে দিনে উঠলে ফুটে পরীস্থানের জরীন্‌ গুল্‌ ! মলিন করে রূপ রাণীদের ফুট্ ল তোমার রূপের ফুল। রূপে হ'লে অপ্সরী আর নৃত্যগীতে কিন্নরী, শ্লোক-রচনায় সরম্বতী ধী-শ্রীমতী সুন্দরী, তীর ছোড়া আর ঘোড়ায় চড়ায় জুড়ি তোমার রইল না, এমন পুরুষ ছিল না যে মূরত বুকে বইল না। রূপের গুণের খ্যাতি তোমার ছাইল ক্রমে সব দিশা, নারীকুলের সূর্য্য তুমি, তুমি মেহের-উন্নিসা ! বাদশাজাদা দেখল তোমায়---দেখল প্রথম নওরোজে, খুসী দিলের খুস্ রোজে তার জীবন মরণ দুই যোঝে। খস্ ল হঠাৎ ঘোমটা তোমার, সরম-রাঙা মুখখানি এঁকে গেল যুবার বুকে রূপ রাণী গো রূপ রাণী ! বাদশাজাদা চাইল তোমায়, বাদশা হ’লেন তায় বাদী ; শের আফগানের বিবি তুমি হ'লে অনিচ্ছায় কাঁদি। বাঘ মারে শের শুধু হাতে তোমায় পাওয়ার হর্ষে গো, বর্দ্ধমানের মাটি হ'ল রাঙা তোমার স্পর্শে গো। ============================ দিনের পরে দিন গেল ঢের ছটা ঋতুর ফুল-বোনা, বাদশাজাদা বাদশা হ'ল তোমায় তবু ভুল্ ল না ; অন্যায়ের সে বৈরী চির ভুল্ ল হঠাৎ ধর্ম-ন্যায় ডুবে ভেসে তলিয়ে গেল রূপের মোহের কি বন্যায়! কুচক্রে তার প্রাণ হারাল সরল পাঠান মহাপ্রাণ। উদারচেত সিংহ-জেতা সিংহ-তেজা শের আফগান ; সেলিমের দুধ মায়ের ছেলে সুবাদারীর তৃষ্ণাতে মারতে এসে পড়ল মারা শেরের অসি-সংঘাতে ; তেজস্বী শের ঘৃণ্য কুতব পাশাপাশি ঘুমায় আজ রাঢ়ের মাটি রাঙিয়ে দ্বিগুণ জাগছে জাহাঙ্গীরের লাজ! সকল লজ্জা ডুবিয়ে তবু জাগ্ ছে নারী, তোমার জয়! --- সকল ধনের সার যে তুমি, রূপ সে তোমার তুচ্ছ নয়। ============================= পাল্কী এল “আগ্রা চল”---শাহান্ শাহের অন্দরে, কাছে গিয়ে দেখলে তফাৎ, আঘাত পেলে অন্তরে। মহলে কই বাদশা এলেন? মৌনে ব্যথা সইলে গো, চোদ্দ আনা রোজ খোরাকে রং-মহলে রইলে গো। রেশমী পটে নক্সা এঁকেস, গড়ে ফুলের অলঙ্কার, বাঁদী দিয়ে বিক্রী ক'রে হ'ত তোমার দিন-গুজার ; সাদা-সিধা সুতির কাপড় আপনি পরে থাক্ তে গো, চাকরাণীদের রাণীর সাজে সাজিয়ে তুমি রাখতে গো। স্পর্শে তোমার জুঁই-বুরুজের শিলায় শিলায় ফুট্ ল ফুল, রূপে গুণে ছাপিয়ে গেল রং-মহলের উভয় কুল। ================================ কথায় বলে মন না মতি,---সেলিমের মন ফিরল শেষ,--- হঠাৎ তোমার কক্ষে এল, দেখ্ ল তোমার মলিন বেশ ; দেখ্ ল তোমার পুষ্প-কান্তি, দেখ্ ল জ্যোতির পুঞ্জ চোখ, ভুলে গেল খুনের আড়াল, ভুল্ ল সে দুধ-ভায়ের শোক। বাদ্‌শা সুধান্‌ "এ বেশ কেন? নিজের দাসীর চাইতে ম্লান !” জবাব দিলে “আমার দাসী---সাজাই যেমন চায় পরাণ। তোমার দাসীর অঙ্গে খামিন্! তোমার খুসীর মতন সাজ।” বাদশা বলেন “সত্যি কথা, দিলে আমায় উচিত লাজ, আজ অবধি প্রধান বেগম তুমি মেহের! সুন্দরী ! চল আমার খাস্ মহলে মহল-আলো অপ্সরী। সিংহাসনে আসন তোমার, আজ থেকে নাম নূরমহল, বাদশা তোমার গোলাম, জেনো, করেছ তার দিল্‌ দখ্ ল।” ================================ পাঁচ-হাজারের এক এক মোতি, এমনি হাজার মৌতির হার বাদ্‌শা দিলেন কণ্ঠে তোমার সাত সাগরের শোভার সার। বাদ্‌শার উপর বাদ্শা হ'লে, বাদ্‌শা হ’লেন তোমার বশ, অফুরাণ যে স্ফূর্ত্তি তোমার, অগাধ তোমার মনের রস। দরবারে বার দিলে তুমি রইলে নাকো পর্দাতে, জাহাঙ্গীর সে রইল শুধু ব্যস্ত তোমার চর্চ্চাতে। পিতা তোমার মন্ত্রী হলেন, তুমি আসল শাহান্ শা, সেনা-নায়ক ভাইটি তোমার যোদ্ধৃ কবি আসফজা। দেশে আবার শান্তি এল ভারত জুড়ে মহোৎসব--- বাড়ল ফসল শিল্প-কুশল হ'ল ফিরে শিল্পী সব। নূতন কত "শিল্প প্রচার করলে ভারত মণ্ডিতে--- ফুলের আত্মা আতর হ'ল অমর হ'ল ইঙ্গিতে! তূমি গো সাম্রাজ্য-লক্ষ্মী কর্ম্মে সদা উৎসাহী জাহাঙ্গীরের পাঞ্জা নিয়ে করলে নারী বাদশাহী ; নারীর প্রতাপ, প্রতিভা আর নারীর দেখে মন্ত্রবল দরবারী সব চটল মনে, উঠল জ্বলে ওমরাদল ; বাদ্‌শাজাদা খুরম্‌ এবং দশহাজারী মহব্বৎ বিষম হ'ল বৈরী তোমার 'তবুও তুমি সূর্য্যবৎ রইলে দীপ্ত, রইলে দৃপ্ত করলে নিরোধ সব হানা ধী-শ্রী-ছটার ছত্র মাথায় ছত্রবর্তী সুল্ তানা। বাদ্‌শা যখন নজর-বন্দী মহব্বতের ফন্দীতে চল্ লে তুমি সিংহী সম চল্ লে স্বয়ং রণ দিতে ; হাতীর পিঠে হাওদা এঁটে ঝিলাম-নদের তরঙ্গে ঝাণ্ডা তুলে লড়তে এলে মাতলে তুমি কী রঙ্গে ; শত্রু মেরে করলে থালি তীরে-ভরা তিন্ টে তূণ, আঘাত পেয়ে কর্ণে কাঁধে যুঝলে তবু চতুর্গুণ ; দুষমনেরা উঁচু ডাঙ্গায়, তুমি নদীর গর্ভে গো, তোমার হানায় অধীর তবু ভাবছে কি যে করবে গো ; হঠাৎ বেঁকে বস্ ল হাতী বিমুখ হ'ল অস্ত্র-ঘায় ফিরলে তুমি বাধ্য হয়ে ক্ষুব্ধ রোষের যন্ত্রণায়। বন্দী স্বামীর মোচন-হেতু হ'লে এবার বন্দিনী, মহব্বতের মুঠা শিথিল করলে ইরান-নন্দিনী ; জিতে তবু হারল শক্র, করলে তুমি কিস্তিমাৎ, তোমার অস্ত্র অমোঘ সদা, তোমার অন্ত্র সে নির্ঘাত ; ফকীর বেশে শত্রু পালায়, তোমার হল জয় শেষে,--- তোড়ে তোমার ঐরাবত ঐ মহব্বত-খাঁ যায় ভেসে। ============================= আজ লাহোরের সহরতলীর কাঁটাবনের আব্ ডালে লুপ্ত তোমার রূপের লহর জঙ্গলে আর জঞ্জালে, জীর্ণ তোমার সমাধি আজ, মীনার বাহার যায় ঝরি, আজকে তুমি নিরাভরণ চিরদিনের সুন্দরী ! হোথা তোমার স্বামীর সমাধ যত্নে তোমার উজল ভায় ঝল্ মলিছে শাহ-ডেরা রতন-মণির আল্ পনায়। গরীব বাপের গরীব মেয়ে তুমি আছ একলাটি,--- সিংহাসনের শোভার নিধি পালং তোমার আজ মাটি! শাহ-ডেরার সুপ্ত মালিক জেগে তোমায় ডাক্ ছে না, তুমি যে আর নাইকো! পাশে সে খোঁজ সে আজ রাখ্ ছে না। সূক্ষ্ম সোনার সূতার বোনা নাই সে গদি তোমার হায়! আজকে তোমার বুকে পাথর, মাথায় পাথর, পাথর পায়। বিশ্মরণী লতার বনে ঘুমাও মাটির বন্ধনে, গোরী ! তোমার গোরের মাটি রূপের গোপী চন্দন এ। সোহাগী! তোর দেহের মাটি স্বামী-সোহাগ সিঁদুর গো, জীর্ণ তোমার শ্রীহীন কবর বিশ্বনারীর শ্রী-দুর্গ! ============================= শিয়রে কি লিখন লেখা! অশ্রভরা করুণ শ্লোক ;--- এ যে তোমার দৈববাণী জাগায় প্রাণে দারুণ শোক ;--- হে সুলতানা! লিখেছ এ কী আফশোষে সুন্দরী ! লিখছ তুমি "গরীব আমি” পড়তে যে চোখ যায় ভরি।--- “গরীব-গোরে দীপ জ্বেল না ফুল দিও না কেউ ভুলে--- শামা পোকার না পোড়ে পাখ, দাগা না পায় বুল্ বুলে।” সত্যি তোমার কবরে আর দীপ জ্বলে না, নূরজাহান ! সত্যি কাঁটার জঙ্গলে আজ পুষ্পলতার লুপ্ত প্রাণ। নিঃস্ব তুমি নিরাভরণ ধূসর ধূলির অঙ্কেতে, অবহেলার গুহার তলায় ডুব্ ছ কালের সঙ্কেতে। ডুবছে তোমার অস্থিমাত্র---স্মৃতি তোমার ডুব্ বে না, রূপের স্বর্গে চিরনূতন রূপটি তোমার যায় চেনা। সেথায় তোমার নাম ঘিরে ফুল উঠছে ফুটে সর্ব্বদাই, অনুরাগের চেরাগ যত উজল জ্বলে বিরাম নাই, চিত্ত-লোকে তোমার পূজা---পূজা সকল যুগ ভরি’ মোগল-যুগের তিলোত্তমা! চির যুগের সুন্দরী!