KHOKON

_

অন্ধ বধূ - যতীন্দ্রমোহন বাগচী

বাংলা কবিতা
অন্ধ বধূ যতীন্দ্রমোহন বাগচী পায়ের তলায় নরম ঠেকল কী! আস্তে একটু চলনা ঠাকুর-ঝি — ওমা, এ যে ঝরা-বকুল ! নয়? তাইত বলি, বদোরের পাশে, রাত্তিরে কাল — মধুমদির বাসে আকাশ-পাতাল — কতই মনে হয় । জ্যৈষ্ঠ আসতে কদিন দেরি ভাই — আমের গায়ে বরণ দেখা যায় ? —অনেক দেরি? কেমন করে’ হবে ! কোকিল-ডাকা শুনেছি সেই কবে, দখিন হাওয়া —বন্ধ কবে ভাই ; দীঘির ঘাটে নতুন সিঁড়ি জাগে — শেওলা-পিছল — এমনি শঙ্কা লাগে, পা-পিছলিয়ে তলিয়ে যদি যাই! মন্দ নেহাৎ হয়না কিন্তু তায় — অন্ধ চোখের দ্বন্ধ চুকে’ যায়! দুঃখ নাইক সত্যি কথা শোন্ , অন্ধ গেলে কী আর হবে বোন? বাঁচবি তোরা —দাদা তো তার আগে? এই আষাড়েই আবার বিয়ে হবে, বাড়ি আসার পথ খুঁজে’ না পাবে — দেখবি তখন —প্রবাস কেমন লাগে ? —কী বল্লি ভাই, কাঁদবে সন্ধ্যা-সকাল ? হা অদৃষ্ট, হায়রে আমার কপাল ! কত লোকেই যায় তো পরবাসে — কাল-বোশেখে কে না বাড়ি আসে ? চৈতালি কাজ, কবে যে সেই শেষ ! পাড়ার মানুষ ফিরল সবাই ঘর, তোমার ভায়ের সবই স্বতন্তর — ফিরে’ আসার নাই কোন উদ্দেশ ! —ঐ যে হথায় ঘরের কাঁটা আছে — ফিরে’ আসতে হবে তো তার কাছে ! এই খানেতে একটু ধরিস ভাই, পিছল-ভারি — ফসকে যদি যাই — এ অক্ষমার রক্ষা কী আর আছে ! আসুন ফিরে’ — অনেক দিনের আশা, থাকুন ঘরে, না থাক্ ভালবাসা — তবু দুদিন অভাগিনীর কাছে! জন্ম শোধের বিদায় নিয়ে ফিরে’ — সেদিন তখন আসব দীঘির তীরে। ‘চোখ গেল ঐই চেঁচিয়ে হ’ল সারা। আচ্ছা দিদি, কি করবে ভাই তারা — জন্ম লাগি গিয়েছে যার চোখ ! কাঁদার সুখ যে বারণ তাহার — ছাই! কাঁদতে গেলে বাঁচত সে যে ভাই, কতক তবু কমত যে তার শোক! ‌‌‍‍‍‌’চোখ’ গেল– তার ভরসা তবু আছে — চক্ষুহীনার কী কথা কার কাছে ! টানিস কেন? কিসের তাড়াতাড়ি — সেই তো ফিরে’ যাব আবার বাড়ি, একলা-থাকা-সেই তো গৃহকোণ — তার চেয়ে এই স্নিগ্ধ শীতল জলে দুটো যেন প্রাণের কথা বলে — দরদ-ভরা দুখের আলাপন পরশ তাহার মায়ের স্নেহের মতো ভুলায় খানিক মনের ব্যথা যত ! এবার এলে, হাতটি দিয়ে গায়ে অন্ধ আঁখি বুলিয়ে বারেক পায়ে — বন্ধ চোখের অশ্রু রুধি পাতায়, জন্ম-দুখীর দীর্ঘ আয়ু দিয়ে চির-বিদায় ভিক্ষা যাব নিয়ে — সকল বালাই বহি আপন মাথায় ! — দেখিস তখন, কানার জন্য আর কষ্ট কিছু হয় না যেন তাঁর। তারপরে – এই শেওলা-দীঘির ধার — সঙ্গে আসতে বলবনা’ক আর, শেষের পথে কিসের বল’ ভয় — এইখানে এই বেতের বনের ধারে, ডাহুক-ডাকা সন্ধ্যা-অন্ধকারে — সবার সঙ্গে সাঙ্গ পরিচয়। শেওলা দীঘির শীতল অতল নীরে — মায়ের কোলটি পাই যেন ভাই ফিরে’!